যুদ্ধের জেরে চার বছরের মধ্যে দ্রুততম সময়ে এশিয়ার উদীয়মান পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। ২০২২ সালের মার্চের পর চলতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ প্রত্যাহার রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময় চীন বাদে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজার থেকে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের শেয়ার বিক্রি করেছেন। খবর দি এজ মালয়েশিয়া।
বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির হিড়িকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান সূচক কসপিতে একদিনে রেকর্ড দরপতন ঘটেছে। বেশকিছু আঞ্চলিক বাজারে অস্থিরতা সামাল দিতে লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহে এমএসসিআই এশিয়া প্যাসিফিক ইনডেক্স ৬ শতাংশের বেশি কমেছে। ছয় বছরের মধ্যে এটিই কোনো সপ্তাহের সর্বোচ্চ দরপতন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের সূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর তুলনায় এশীয়ার বাজারগুলোর পারফরম্যান্স এপ্রিলের পর থেকে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক হারে শেয়ার বিক্রির প্রবণতা আঞ্চলিক বাজারগুলোয় চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির বাজারগুলো থেকে পুঁজি সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার এ প্রবণতা বাজারজুড়ে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এশিয়ার উদীয়মান পুঁজিবাজার থেকে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের পুঁজি প্রত্যাহার মূলত গত কয়েক মাসের জনপ্রিয় এক বিনিয়োগ কৌশলের চরম বিপর্যয়কে নির্দেশ করছে। বিনিয়োগ মহলে আলোচিত ‘সেল আমেরিকা, বাই এশিয়া’ (যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বিক্রি, এশিয়ার শেয়ার কেনা) কৌশলের বিপরীতে এখন দেখা দিচ্ছে উল্টো চিত্র।
দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীরা মার্কিন শেয়ারবাজারের চড়া দাম এড়িয়ে এশিয়ার উদীয়মান বাজারে ঝুঁকছিলেন। মূলত ডলারের মান কমে আসা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তি খাতের বিকাশে এশিয়ার চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি চাহিদাকে পুঁজি করেই চলছিল এ বিনিয়োগ বাণিজ্য।
অলস্প্রিং গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্টসের ফান্ড ম্যানেজার গ্যারি ট্যান বলেন, ‘ডলারের মান হ্রাস ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকার প্রত্যাশায় বৈশ্বিক তহবিলগুলো এশিয়ার বাজারে বড় বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত সেসব হিসাবনিকাশকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা এখন নতুন করে হিসাব কষছেন। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্বজুড়ে ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা বাড়লে ডলারের মান দীর্ঘ সময় চড়া থাকতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় তেলের দাম বেড়ে গেলে তা আবারো বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপকে উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অনিশ্চয়তাই মূলত এশিয়ার বাজার থেকে বিনিয়োগকারীদের সরিয়ে নিচ্ছে।
এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা। ড্যানিয়েল ব্লেক ও জোনাথন গার্নারের নেতৃত্বাধীন বিশ্লেষকদের এক সাম্প্রতিক নোটে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর এশিয়ার দেশগুলোর নির্ভরশীলতা অত্যন্ত সংকটজনক পর্যায়ে রয়েছে। তারা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকিগুলো নিয়ে বাজার বর্তমানে ‘অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী’ আচরণ করছে।
অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সব ক্ষেত্রেই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর এশিয়ার দেশগুলোর অতিনির্ভরশীলতা রয়েছে। এ অবস্থায় ভূরাজনৈতিক সংঘাত এ সরবরাহ চেইনকে যেকোনো সময় ব্যাহত করতে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তাদের পরামর্শ হলো বর্তমান অস্থিতিশীল বাজারে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ অবস্থান বজায় রাখাই শ্রেয়। অর্থাৎ, এ অস্থিরতাকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। বাজার যতটা নিশ্চিন্তে রয়েছে, বাস্তবে জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি তার চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে করছেন তারা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা এশিয়ার দেশগুলোর জন্য যতটা উদ্বেগজনক, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ততটা নয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় অর্থনীতিগুলো জ্বালানি তেলের বড় আমদানিকারক হওয়ায় এ অঞ্চলে মূল্যস্ফীতি ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার ঝুঁকি অনেক বেশি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে অপরিশোধিত তেলের ‘নিট রফতানিকারক’ দেশে পরিণত হওয়ায় তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেক বেশি সুসংহত।
কাঠামোগত এ পার্থক্যের কারণেই বাজার বিশ্লেষকরা এশিয়াকে ‘নিট আমদানিকারক অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। ফলে তেলের দাম বাড়লে বা সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে এশিয়ার দেশগুলো সরাসরি বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ে। বিশেষ করে তেলের দামের আকস্মিক বৃদ্ধিতে এ দেশগুলোর অর্থনীতিতে যে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়, তা সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে প্রায়ই কঠিন ও সংকুচিত মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হয়।